ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার প্রধান মার্ক জাকারবার্গ তাঁর মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ফ্যাক্টচেকিং বা তথ্য যাচাই নীতিমালা শিথিল করার ঘোষণা দিয়েছেন। গত ৭ জানুয়ারি এক ভিডিও পোস্টে তিনি এই ঘোষণা দেন। বিশ্লেষকেরা মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্পের ক্ষমতা গ্রহণের মাত্র দুই সপ্তাহ আগে মেটাপ্রধানের এই ঘোষণার অন্যতম লক্ষ্য ট্রাম্প প্রশাসনের অনুগ্রহ লাভ এবং রক্ষণশীল মার্কিনীদের খুশি করা। তবে এ জন্য তাকে বিশ্বের অন্যান্য অঞ্চলে মাশুল গুনতে হতে পারে।
ভিডিও বার্তায় মার্ক জাকারবার্গ বলেন, ‘আমার মনে হচ্ছে আমরা একটি নতুন যুগে আছি।’ এই এক বাক্য দিয়ে জাকারবার্গ সুনির্দিষ্টভাবে কী বুঝিয়েছেন, তা স্পষ্ট নয়। তবে এর দ্বারা তিনি যে নতুন কিছুর ইঙ্গিত দিয়েছেন, তা স্পষ্ট। পাঁচ মিনিটের ওই ভিডিও বার্তায় জাকারবার্গ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভবিষ্যৎ, সেন্সরশিপ, যুক্তরাষ্ট্রের ব্যবসা-বাণিজ্য ও সরকারে মধ্যকার সম্পর্ক নিয়ে বিভিন্ন আভাস দিয়েছেন।
ব্রিটিশ সাময়িকী দ্য ইকোনমিস্টের এক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, এখন পর্যন্ত সম্ভবত বিশ্বে সবচেয়ে বড় ফ্যাক্টচেকিং কার্যক্রমের অবকাঠামো রয়েছে মেটার। যুক্তরাষ্ট্রসহ বিশ্বের নানা দেশ ও অঞ্চলে এই কাজে তাদের হাজার হাজার লোকবল রয়েছে। কিন্তু নিজেদের মালিকানাধীন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসে তথ্য যাচাই বন্ধ করতে যাচ্ছে মেটা। নিজ দেশ যুক্তরাষ্ট্র দিয়েই এই কাজ শুরু হচ্ছে। ক্রমান্বয়ে বিশ্বের অন্যান্য দেশ ও অঞ্চলে এটি কার্যকর করা হবে।
আনুষ্ঠানিক তথ্য যাচাইয়ের কাজটি মেটা এখন স্বেচ্ছাসেবী ‘কমিউনিটি নোটসের’ হাতে ছেড়ে দিচ্ছে। এটি ইলন মাস্কের মালিকানাধীন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সের (সাবেক টুইটার) সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সফটওয়্যার। এর মাধ্যমে এক্স ব্যবহারকারীরা কোনো পোস্ট, ছবি বা ভিডিও‑এর যথার্থতা যাচাই করে প্ল্যাটফর্মটিকে অপপ্রচার, ভুল বা ক্ষতিকর তথ্য সম্পর্কে সতর্ক করা হয়। এক্সের অ্যালগরিদম এসব পরামর্শ সঠিক মনে করলে অভিযুক্ত কনটেন্টটি সরিয়ে দেয়।
তথ্য যাচাইয়ের শিথিলতার পাশাপাশি আভিবাসন ও লিঙ্গ-সংক্রান্ত কনটেন্টের বিষয়েও কড়াকড়ি কমানোর ঘোষণা দিয়েছেন জাকারবার্গ। কারণ হিসেবে তিনি বলেছেন, ‘আমাদের বর্তমান নিয়মগুলো মূলধারার আলাপ-আলোচনার সঙ্গে তাল রেখে চলতে পারছে না। তাই এখন থেকে মেটার কোনো কনটেন্ট প্ল্যাটফর্মটির কোনো নিয়ম লঙ্ঘন করলে সেটিকে স্বয়ংক্রিয় (এআই) ফিল্টার দিয়ে সরিয়ে দেওয়া হবে না। কেবল কেউ অভিযোগ করলেই তা সরিয়ে দেওয়া হবে।’
জাগারবার্গের ভিডিও বার্তার পরে এক পোস্টে মেটা জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত তাদের স্বয়ংক্রিয় ফিল্টার যত কনটেন্ট সরিয়েছে, সেগুলোর প্রায় ১০-২০ শতাংশের ক্ষেত্রেই ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
নিজেদের মালিকানাধীন ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম ও থ্রেডসে তথ্য যাচাই বন্ধ করতে যাচ্ছে মেটা।
নিজেদের নীতিমালা থেকে সরে আসার ব্যাপারে জাকারবার্গ একাধিক কারণ বলেছেন। একটি কারণ হলো, সাম্প্রতিক নির্বাচনগুলোতে বাকস্বাধীনতাকে আগ্রাধিকার দেওয়ার ক্ষেত্রে সাংস্কৃতিক জগতে টিপিং পয়েন্টের পরিবর্তন হওয়া। অথবা এসব নির্বাচনের বিজয়ী প্রার্থীদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতেই নীতিমালা শিথিল করছে মেটা। আরও স্পষ্ট করে বললে, ট্রাম্পের চাহিদাকে মাথায় রেখেই নিজেদের নীতিমালা কাটছাঁট করছেন জাকারবার্গ।
আসন্ন ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে জাকারবার্গ একাই ঘনিষ্ঠতা চাইছেন, বিষয়টি এমন নয়। অ্যাপলের সিইও টিম কুক থেকে শুরু করে ওপেনএআইয়ের সিইও স্যাম অল্টম্যানের মতো ব্যক্তিরাও ট্রাম্প প্রশাসনের অনুগ্রহ চাইছেন। তাঁরা সবাই ট্রাম্পের ২০ জানুয়ারির অভিষেক অনুষ্ঠানের তহবিলে অন্তত ১০ লাখ ডলার করে অর্থ দিয়েছেন। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে দাবি করা হয়েছে, আমাজনের স্টুডিও থেকে ৪ কোটি ডলার ব্যয় করে ট্রাম্পের স্ত্রী মেলানিয়ার ওপর একটি তথ্যচিত্র নির্মাণ করা হয়েছে।
গত নির্বাচনের আগে ট্রাম্প ফেসবুককে ‘গণশত্রু’ বলে অভিযোগ করেছিলেন। তখন তিনি হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, ‘নির্বাচনে হস্তক্ষেপ করলে জাকারবার্গকে “বাকি জীবনের জন্য” জেলে থাকতে হবে।’ অন্যদিকে গত বছরের এপ্রিলে ইনস্টাগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপের অধিগ্রহণ বাতিলের জন্য মেটার বিরুদ্ধে ব্যবসার নীতিমালা লঙ্ঘনের দায়ে একটি মামলা করা হয়। মেটার নীতিমালা শিথিল করতে জাকারবার্গকে এসব কিছু উদ্বুদ্ধ করেছে বলে মনে করেন বিশ্লেষকেরা।
ইকোনমিস্টের বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, গত নভেম্বরে ট্রাম্পের বিজয়ের আগে থেকেই কনটেন্ট সংশ্লিষ্ট নীতিমালা শিথিল করতে শুরু করেছে মেটা। ২০২০ সালের মার্কিন নির্বাচন ও করোনা মহামারিকে কেন্দ্র করে ছড়িয়ে পড়া মিথ্যা তথ্যের বিরুদ্ধে প্রায় পাঁচ বছর আগে প্ল্যাটফর্মটি এই নীতিমালা গ্রহণ করেছিল।
কনটেন্ট সংশ্লিষ্ট নীতিমালা শিথিল করলে নিজেদের প্ল্যাটফর্মে ‘বাজে কনটেন্ট’ বাড়ার শঙ্কার কথা জাকারবার্গ নিজেই স্বীকার করেছেন। এর ব্যবসায়িক ক্ষতির দিকটিও বেশ বড় হতে পারে। এক্ষেত্রে এক্স শিক্ষণীয় হতে পারে। গবেষণা সংস্থা ই-মার্কেটের অনুমান, মাস্ক এক্স অধিগ্রহণের এক বছরের মাথায় প্ল্যাটফর্মটির বিজ্ঞাপন রাজস্ব অর্ধেকের বেশি কমেছে। মাস্ক অধিগ্রহণ করার পর থেকে যুক্তরাষ্ট্রে প্ল্যাটফর্মটির ব্যবহারকারীর সংখ্যা এক-দশমাংশের বেশি কমেছে।
অন্যদিকে নীতিমালা শিথিল করায় বিদেশেও মেটার ব্যবসা ঝুঁকিতে পড়তে পারে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের ডিজিটাল সার্ভিসেস অ্যাক্ট অনুযায়ী সব অনলাইন প্ল্যাটফর্মকে ব্লকটির আইন মেনে চলতে হবে। অন্যথায় বড় অঙ্কের জরিমানা গুনতে হবে।
ইউরোপীয় কমিশনের প্রযুক্তিবিষয়ক মুখপাত্র থমাস রেগনিয়ার গত ৮ জানুয়ারি জার্মান রেডিও স্টেশন এমডিআরকে বলেন, ‘যদি মেটা ইইউর ডিজিটাল পরিষেবা আইন মেনে চলতে ব্যর্থ হয়, তবে তাঁরা প্রযুক্তিপ্রতিষ্ঠানটিকে জরিমানা করতে পারেন। এসব বড় প্রতিষ্ঠান যেখানেই থাকুক না কেন, ইইউতে তাদের পরিষেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে চলতে হবে।’ জার্মানির প্রযুক্তিবিষয়ক মন্ত্রী ভলকার ভিসিং বলেন, ‘এ ব্যাপারে তিনি ইইউ কমিশনের ওপর আস্থা রাখছেন। কমিশন মেটার কর্মকাণ্ড ঘনিষ্ঠভাবে পর্যবেক্ষণ করবে। নিবিড়ভাবে পরীক্ষা করবে। প্রয়োজনে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।’
অস্ট্রেলিয়া, কানাডাসহ বিশ্বের আরও অনেক দেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে কড়া আইন রয়েছে। ভারতেও এ‑সংক্রান্ত নানা জটিল আইন আছে। বিশ্বের আরও নানা দেশ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম নিয়ে কড়াকড়ি আইন করার কথা ভাবছে। এ ক্ষেত্রে ট্রাম্প প্রশাসনের সুবিধা পাওয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্রে নীতিমালা শিথিল করার কারণে বিশ্বের অন্য স্থানে জাকারবার্গকে মাশুল গুনতে হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
Tags
আন্তর্জাতিক